সোমবার, ২৩শে নভেম্বর, ২০২০ ইং, ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
সোমবার, ২৩শে নভেম্বর, ২০২০ ইং, ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
সোমবার, ২৩শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

গুলি করে হত্যার চেয়েও বিনা চিকিৎসায় মানুষ খুন ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক

পীর হাবিবুর রহমান

হঠাৎ কোনো সন্ত্রাসী বা উন্মাদের গুলিতে মানুষ নিহত হওয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর বর্বর হত্যাকান্ড হচ্ছে করোনাকালে বিনা চিকিৎসায় মানুষের করুণ মৃত্যু। হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় যারা মারা যাচ্ছেন তারা নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার। গুলি করে মানুষ হত্যার চেয়েও তাই আজ বিনা চিকিৎসায় যারা মারা যাচ্ছেন তারা দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ ও অথর্ব স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীলদের ঠান্ডা মাথার খুন। গুলি করে মানুষ হত্যার দায় সন্ত্রাসী বা সমাজবিরোধীদের। আইন তাদের কাঠগড়ায় এনে মৃত্যুদন্ড থেকে নানা দন্ডে দন্ডিত করে।

রাষ্ট্র মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে যাদের দায়িত্ব দিয়েছে, জনগণের অর্থে যাদের বেতন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তারা আজ তাদের মালিক হত্যাকারী, খুনি। ক্ষমতার মালিক জনগণ হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন চিকিৎসা না পেয়ে। রাষ্ট্র এই বিনা চিকিৎসায় হত্যার অভিযোগে দায়িত্বশীল খুনিদের দন্ড দেবে কি, কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীলরা খুনির চেহারায় দম্ভের সঙ্গে বহাল আছে। দু-একজনের বদলি সমাধান নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দেখলে নির্বোধ মনে হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের চেহারায় চতুরতা। এখনো স্বাস্থ্য খাতে মাস্ক কেলেঙ্কারি হয়। এখনো গোয়েন্দা সংস্থা হাতেনাতে ধরে সরকারি হাসপাতালের ডাকাতি। এখনো হরিলুটের প্রস্তাবনা ছক বেঁধে তৈরি হয়। স্বাস্থ্য খাতকে দেউলিয়া করে যারা আজ বিনা চিকিৎসায় মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দিচ্ছে তাদের ওপর আইনের খড়গ নামে না। করোনাকালের আগেই আমরা গণমাধ্যমে অনেক বলেছি, বাংলাদেশ প্রতিদিন বছরের পর বছর রিপোর্ট করেছে। সংসদে কেউ কেউ ঝড় তুলেছেন। তবু কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙেনি। মানুষেরও বোধোদয় হয়নি।

বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার জনগণের জন্য ব্যাকুল হৃদয়ে কত বলেছেন। আহাজারি করেছেন। হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কাজ হয়নি। আহারে! মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা চিকিৎসা খাতে কত বরাদ্দ দিলেন। অবকাঠামোর উন্নয়নে। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে। মানুষ সেবা পায়নি, ভাগ্য বদল হয়েছে সিন্ডিকেটের। কী নির্লজ্জ লুট উপর থেকে নিচ পর্যন্ত! জনগণের সেবক, তাদের করুণাশ্রিত দালাল, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী আর ঠিকাদার মিলে ভাগ করে খাওয়া। মরছে এখন মানুষ। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে পড়ে থাকে, কপালে চিকিৎসা জুটেনা! সকাল আসে চারদিকে মৃত্যুর বিষাদ খবরে, নিকষ অন্ধকার রাত নামে বেদনাবিধুর দুঃসংবাদে। অস্থিরতায় ঘুম হারাম করে সবার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের সুপারিশে এ তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় নাম থাকা ১৪ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরকে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো- এটা দুদক গত ডিসেম্বরে দিলেও এখন বলা হলো কেন? কোন তদন্ত, কোন মামলা, আইনি লড়াইয়ে বিচার হলো না! এই সময়ে এটা দিয়ে কি দেউলিয়া দুর্নীতিগ্রস্ত চিকিৎসা খাতের বিতর্ক আড়াল করার চেষ্টা? অবাক বিস্ময়কর হলো যে, এই ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নাম নেই স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির একচ্ছত্র আধিপত্য রাখা রাজ্জাকের জেএমআই গ্রুপ এবং ঠিকাদার মিঠুর প্রতিষ্ঠানের। রাজ্জাকের জেএমআই তো করোনাকালেও এন৯৫ মাস্কের নামে জাল মাস্ক সরবরাহ করে রেহাই পেল! কীভাবে? এ যেন স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির রাঘববোয়ালদের বাঁচিয়ে চুনোপুঁটিদের ওপর জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা! কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের বিদায়ী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ গত ৩০ মে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে লেখা চিঠিতে স্পষ্টভাবেই ঠিকাদার মিঠুর নাম উল্লেখ করেছিলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের কিছু কর্মকর্তা ঠিকাদার মিঠুর সঙ্গে মিলে কোটি কোটি টাকার যে দুর্নীতি করেছিলেন সে বিষয়েও বিস্তারিত জানিয়েছেন। ঠিকাদার মিঠু বিনা টেন্ডারে কয়েক শ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছিল। অথচ কালো তালিকায় এই মিঠুর নাম নেই! কতটা দুর্নীতি হলে কেরানি আবজাল ১৫০০ কোটি টাকার মালিক হয়ে বিদেশ চলে যায়? তাদের বিরুদ্বে ব্যবস্থা কই যারা চিকিৎসা খাতের বরাদ্দকে লুটের সম্পদ বানিয়েছিলেন ঠিকাদারদের নিয়ে? তারাতো মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন, অধিদফতরের হর্তাকর্তা থেকে জেলা সদর হাসপাতালের দায়িত্বশীলই নন, দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন। অনেকে কেরানি, দালাল। ঠিকাদার আইন ও বিধিতে স্বচ্ছতায় কাজ করলে কত পার্সেন্ট লাভ করতেন? সবাই মিলে লুটের কর্মযজ্ঞেই তো বেহাল অবস্থা! অপরাধী তো তারাই যারা দুর্নীতিকে ব্যবস্থা করেছিলেন! তাদের সর্বগ্রাসী লুটেই তো আজ তাই আইসিইউ, অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন, টেস্ট, ল্যাব, সেবার আকুতি। কোথাও নেই পরিপূর্ণ এমনকি চিকিৎসাসেবার সুযোগ!

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল বা সিএমএইচে চাইলেই সবাই যেতে পারেন না। আর সিএমএইচে যুগ যুগ ধরে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে পারলে অন্য সরকারি হাসপাতাল কেন পারে না? সিএমএইচে দক্ষ জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা আছে। নিয়ম শৃঙ্খলা আছে। সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম স্বাভাবিকে পরিণত। জবাবদিহিতা শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। সরকারি হাসপাতালে কেনো দক্ষ ব্যবস্থাপনা নেই, কেন সুযোগ-সুবিধা নেই, কারণ ব্যর্থ দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্ব তা গড়ে উঠতে দেয়নি। উপর থেকে সিন্ডিকেটের ধারায় চলে। সেবাহীন এক দেউলিয়াত্ব। আইসিইউ নেই, চিকিৎসক নেই। নার্স নেই। কত হাসপাতালে কত দামি মেশিন প্যাকেটবন্দী। অথচ টেস্ট নেই, টেকনোলজিস্ট নেই। বাইরে কমিশন খেয়ে রোগীকে সেখানে পাঠান। পাঁচতারকা হাসপাতালে সেবা নয় বাণিজ্য। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা লাভের ক্ষমতা নেই। তাও আগুনে পুড়ে মরে রোগী। কী ভয়ঙ্কর খুন, কী মর্মান্তিক মৃত্যুর ছবি ভাইরাল হয়। উঠে আসে চিকিৎসা ব্যবস্থার অসুস্থ চিত্র। সরকারি-বেসরকারি মিলে স্বাস্থ্যসেবা সুসংহত হয়নি। ঠান্ডা মৃত্যুর হিমশীল অনুভূতি বয়ে যায় মানব শরীরে হাসপাতাল বললেই।

আমরা করোনা প্রতিরোধের প্রথমপর্বে ব্যর্থ।

এখন প্রতিকার। চিকিৎসা ও সেবা দিতেই হবে। কিন্তু দেওয়া হচ্ছে না। টেস্ট পর্যাপ্ত নেই। অভিশপ্ত লুটেরাদের জন্য মানুষ জীবন দিতে পারে না। কিন্তু দিচ্ছে। করোনা রোগীদের কেন, কোনো নাগরিককেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। তবু অবহেলা হচ্ছে! স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ ভর্তি হয়েছিলেন সিএমএইচে। মানুষের জন্য রেখেছেন কুয়েত মৈত্রী, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল।

এসব হাসপাতালের নাম আগে শুনেছেন কেউ?

হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে পথে মৃত্যুর খবরে হৃদয় ভাঙে। কেউ নিরাপদ বোধ করে না। এটা স্বাস্থ্যসেবা? তারপরও বড় বড় কথা! দক্ষ সৎ ম্যানেজমেন্ট আনতে হবে স্বাস্থ্য বিভাগে। সরকারি হাসপাতালে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সমন্বয়ে কবে গড়ে তোলা হবে দক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থা? মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত ও জীবন রক্ষাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দুয়ারে কখন কার কড়া নাড়ে করোনা, কখন কে আক্রান্ত হন, কখন কার মৃত্যু জানে না কেউ। কিন্তু চিকিৎসাসেবা অধিকার। সেটা পেয়ে মরলেও শান্তি। রাষ্ট্র তার জনগণের জীবন বাঁচাতে চেয়েছে। কিন্তু এখন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু, সে তো খুন! এই খুন মেনে নেওয়ার নয়।

শেয়ার করুন:Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email

মন্তব্য করুন

মন্তব্য