রবিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ ইং, ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
রবিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ ইং, ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
রবিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ ইং

ভ্যাকসিন নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত

ভ্যাকসিন নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত
ভ্যাকসিন নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত

সারা পৃথিবীতেই এখন করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ হচ্ছে। কয়েকটি টিকার কার্যকারিতাও ঘোষণা করেছে উৎপাদক কোম্পানি। আর ভ্যাকসিনের এ দৌড়ে বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে ভ্যাকসিন-বিষয়ক জাতীয় পরিকল্পনার কাজ প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। এখন কেবল মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অপেক্ষা।

ভ্যাকসিন দেশে এলে সেটি কীভাবে, কাদের, কখন দেওয়া হবে; তা নিয়ে একটি বড় পরিকল্পনা হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ‘পৃথিবীতে যদি ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয় তাহলে নিশ্চয়ই বাকিরাও পাবে। তবে সেটা হয়তো একসঙ্গে হবে না, ধাপে ধাপে পাবে। সেই সময় পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ, একসঙ্গে সবাইকে ভ্যাকসিন দেওয়ার মতো সক্ষমতা শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর কোনও দেশেরই নেই। কাজেই যাদের আগে দেওয়া দরকার তাদেরই দেওয়া হবে।’

গত ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, অক্সফোর্ড থেকে তিন কোটি টিকা কিনবে বাংলাদেশ। প্রথম দফায় এসব টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নীতিমালা অনুযায়ী জনগণের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের টিকা এলে সেটা পর্যায়ক্রমে সবাই পাবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব মানুষই যাতে দ্রুত ভ্যাক্সিন পায় সেই উদ্যোগই নিচ্ছে সরকার।

এদিকে, খুব তাড়াতাড়িই বাংলাদেশ করোনার ভ্যাকসিন পাবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসচিব আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘সেটা আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি অথবা তারও আগে হতে পারে।’

ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট টাস্কফোর্স কমিটি, বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করেছে সরকার। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদফতর গঠন করেছে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড ডেপ্লয়মেন্ট কোর কমিটি।

কোর কমিটির এই পরিকল্পনাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। সেখানে ভ্যাকসিন দেওয়ার বিষয়ে কাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে, কাজের সমন্বয়, আইনগত প্রস্তুতি, যোগাযোগ ও জনসচেতনা সৃষ্টি, কোল্ড চেইন সক্ষমতা, টিকার নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, পরিবহন এবং ওভার অল রিকোয়ার্ড বাজেট—সবকিছুই পরিকল্পনাতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. শামসুল হক।

তিনি জানান, যেভাবে ভ্যাকসিন কোভ্যাক্সের সুবিধার আওতায় আসার ‍সুযোগ রয়েছে—প্রথমে আসবে তিন শতাংশ, এরপর সাত শতাংশ, তারপর আসবে ১১ থেকে ২০ শতাংশ।

ডা. শামসুল হক বলেন, ‘২০ শতাংশের পর ২১ থেকে ৪০ এবং ৪১ থেকে ৮০ শতাংশ করা হয়েছে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, একবারেই ডেপ্লয়মেন্ট প্ল্যান আমরা করে রেখেছি। যাতে আমাদের এই কাজটা আবার দ্বিতীয়বার না করতে হয়।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর জানান, প্রথম ২০ শতাংশ ভ্যাকসিন সব দেশ পেয়ে যাওয়ার পরও যদি কোনও দেশ মনে করে তাদের আরও জনগোষ্ঠীকে তারা দিতে চায়, তাহলে বাকি ২১ শতাংশ থেকে দিতে পারবে। এইভাবে যদি ৮০ শতাংশ মানুষ পর্যন্ত ভ্যাকসিন দেওয়া যায় তাহলে প্রায় ১৩ কোটি মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়া যাবে; কিন্তু ২০ শতাংশ হারে প্রথম হিসেবে ৩৪ মিলিয়ন বা তিন কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য ভ্যাকসিন পাবে বাংলাদেশ।

তিনি জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে টিকাবিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট-জিএভিআই বা গ্যাভির কাছে জাতীয় ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান দিতে হবে, কিন্তু তার আগেই সরকারের কাছে এটা জমা দিতে হবে আমাদের। এই প্ল্যান রিভিউ করবে গ্যাভি, সেটা হবে ডিসেম্বর থেকে মার্চের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। তবে এখানে কথা হচ্ছে, যারা আগে এই প্ল্যান জমা দেবে, তারাই আগে ভ্যাকসিন পাবে। আর আমরা চেষ্টা করছি, সাত ডিসেম্বর প্রথম দিকেই গ্যাভির কাছে সাবমিট করার জন্য। আমরা পেছনে থাকতে চাই না। সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। গ্যাভি জানিয়েছে, তাদের ভ্যাকসিনের প্রথম শিপমেন্ট হবে ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে। এর মধ্যে আমরা এ সংক্রান্ত সব প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারবো, যাতে ভ্যাকসিন সময়মতো পেতে পারি। আর গ্যাভি ছাড়াও একইতালে ভ্যাকসিন কেনার জন্য ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান করে যাচ্ছি—যেন যেটা আগে পাই, সেটা দিয়েই শুরু করতে পারি।’

এখানে পাওয়া যাবে তিন কোটি ডোজ, কিন্তু প্রতিমাসে তারা ৫০ লাখ করে সাপ্লাই দেবে বলে জানান ডা. শামসুল হক।

গত ২২ নভেম্বর কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি তাদের ২২তম সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যাল চুক্তি করেছে এবং এ জন্য অর্থ বরাদ্দও হয়েছে।

কমিটি এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানিয়ে মতামত দিয়ে বলেছে, প্ল্যানটি সম্পূর্ণ ও যথাযথ। একইসঙ্গে সভায় মতামত দেওয়া হয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্যাকসিন বিতরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আর এ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডা. মো শামসুল হক  বলেন, ‘বাংলাদেশ গ্যাভি-কোভ্যাক্স থেকে ৬৮ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৮০ লাখ (প্রতিজন দুই ডোজ) ডোজ করোনার ভ্যাকসিন পাচ্ছে বাংলাদেশ। মোট জনসংখ্যার শতকরা ২০ শতাংশ হারে ধাপে ধাপে বাংলাদেশ এই ভ্যাকসিন পাবে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে।’

ডা. শামসুল হক বলেন, ‘গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত মিটিং হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্যাকসিন কার্যক্রম সর্ম্পকে জানতে চেয়েছিলেন, আমরা এ সংক্রান্ত সবকিছু তাকে অবহিত করেছি।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন ছাড়া দেশে কোনও ভ্যাকসিন আমরা নিতে পারবো না, যখনই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন দেবে, তখনই দেশে ভ্যাকসিন আসবে।’

অপরদিকে, গত ৫ নভেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট এবং বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। সে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রতি ডোজ ভ্যাকসিন কিনবে চার ডলার করে, আর এর সঙ্গে পরিবহনবাবদ যোগ হবে এক ডলার।

তিনি জানান, সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ পর্যায়ক্রমে তিন কোটি ভ্যাকসিন পাবে। এর জন্য সরকারের ব্যয় হবে এক হাজার পাঁচশ’ উননব্বই কোটি তেতাল্লিশ লাখ টাকা। অর্থাৎ ভ্যাকসিন কেনা থেকে শুরু করে মানুষের শরীরে দেওয়া পর্যন্ত এই টাকা প্রয়োজন হবে। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় অর্ধেক পরিমাণ প্রায় ৭৩৫ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছাড় করেছে।

‘তবে এই ভ্যাকসিন অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রিকোয়ালিফায়েড হতে হবে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকতে হবে। জনগণের সেফটির (নিরাপত্তা) কথা চিন্তা করে সবকিছু করা হবে; যদিও চুক্তি করা হয়েছে।

‘এ দুটি ভ্যাকসিনের সোর্স ছাড়াও সিনোভ্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে, রাশিয়ার স্পুৎনিক এগিয়ে আসছে, তাদের সঙ্গেও আমাদের যোগাযোগ রয়েছে’।—বলেন ডা. শামসুল হক।

ন্যাশনাল ভ্যাক্সিন ডেপ্লয়মেন্ট কমিটি হয়েছে, যাদের কাজ একেবারেই শেষ পর্যায়ে এবং তাদের কাজ মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে। কমিটির চেয়ার ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত, তবে সেটা এখনও জমা দেয়নি। গত ২৬ নভেম্বর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে মিটিং হয়েছে, আমাদের পরিকল্পনা সেখানে শেয়ার করেছি। অন্যান্য যারা অংশীদার রয়েছেন সেখানে তারা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন, যদিও পরিকল্পনাটা সবাই এপ্রিশিয়েট করেছে। সেখানে “মেজর চেঞ্জ” খুব বেশি কিছু নেই। শেষ পর্যায়ে আমরা কাজের “ফাইন টিউনিং” করছি।’

অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘এখন আসলে যেগুলো কাজ হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে ফাইন টিউনিং বা আরেকটু বেশি দেখা। প্রক্রিউরমেন্ট কীভাবে হবে—সেগুলোর চূড়ান্ত করা, এ রকম কিছু কিছু জিনিস চলছে। মোটামুটি এটা চূড়ান্ত পর্যায়ে।’

তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে কাজ হয়ে গেছে, সবকিছু প্রায় চূড়ান্ত। এখন কেবল মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অপেক্ষা।’

শেয়ার করুন:Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
Email this to someone
email

মন্তব্য করুন

মন্তব্য